
৯০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ তদন্তের জন্য ডাটা এন্ট্রি চলছে : মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা
সিনিয়র রিপোর্টার / দ্যা লিগ্যাল ভয়েস টোয়েন্টিফোর মিডিয়া : ঢাকা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বীর প্রতীক বলেছেন, ৯০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ তদন্তের জন্য ডাটা এন্ট্রির কাজ চলছে। তিনি বলেন, ‘এপর্যন্ত ৯০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অভিযোগ পেয়েছি। এরমধ্যে ৪০ হাজার ডাটা এন্ট্রি হয়ে গেছে। ৫০ হাজার ডাটা এন্ট্রির কাজ চলমান রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় এখন সেগুলো যাছাই-বাছাই করছে।’ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বীর প্রতীক- ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনে অসামান্য অবদানের জন্য বীর প্রতীক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৫ আগষ্ট দিবাগত মধ্যরাতের পর অর্থাৎ ১৬ আগস্টের ভোর রাতে চট্টগ্রাম বন্দরে পরিচালিত নৌ গেরিলা অপারেশন ‘জ্যাকপটের’ ডেপুটি কমান্ডার। দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর ও নৌ বন্দরগুলো থেকে পাকিস্তানি সেনাদের বিতাড়িত করে মুক্তাঞ্চল করার এই যুদ্ধ অপারেশন জ্যাকপট। ওই সময় অপারেশন জ্যাকপটের খবর দেশ-বিদেশের সংবাদ মাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করার কারণে সেদিন রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধারা মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য দ্বিগুণ উৎসাহ-উদ্দীপনায় যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল। অপারেশন জ্যাকপট ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নৌ-সেক্টর পরিচালিত সফলতম গেরিলা অপারেশন। এটি ছিল একটি আত্নঘাতি অপারেশন। এই অপারেশনে ক্ষতিগ্রস্ত পাকিস্তানি অস্ত্র ও রসদবাহী জাহাজগুলোর পাশাপাশি পাকিস্তানি বাহিনীকে সাহায্যকারী অনেক বিদেশী জাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব সারাবিশ্বে পরিচিতি পায়। মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা- বাসস’র সাথে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেছেন উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বীর প্রতীক। কথা বলেছেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, যুদ্ধে যাবার স্বপ্ন, বিজয় অর্জন নিয়ে। শুনেছেন মেজর জিয়ার কন্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা। বলেছেন, সেই স্বপ্ন এবং বর্তমানের বাস্তবতা দেখলে কষ্ট পাই। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে ফেরিওয়ালাদের রাজনৈতিক বাণিজ্য, মুক্তিযোদ্ধাদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন, রাজনৈতিক বিবেচনায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সৃষ্টি সহ সামগ্রিকভাবে মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় রাজনীতির রঙে রঙ্গীন করা হয়েছে। এখনো বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়। দারিদ্র, নারী অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবার মতো মৌলিক বিষয় নিয়ে সংগ্রাম করতে হয়। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বাসস প্রতিনিধির সাথে আলাপকালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বলেন, রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছি বিবেকের তাড়নায়। সেদিন ২২ বছরের এই যুবক যুদ্ধে গিয়েছিল পাকিস্তানি শাসকের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে। স্বপ্ন ছিল স্বাধিকারের। স্বপ্ন ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতার, অর্থনৈতিক স্বাধীনতার। বাঙালির সামাজিক মর্যাদার। কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিলাম না। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসাবে বেঁচে থাকার সংগ্রামে এসএসসি পাশের পর বাড়ী থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম কাজের সন্ধানে অচিন এলাকা খুলনায়। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গেলে তো সেই সময়ের প্রেক্ষাপট এখন উপস্থাপন করা কোনভাবেই সম্ভব হবে না। সেটা একটা উত্তাল গণ আন্দোলনের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা স্বাধীকারের চেতনা। পাকিস্তানীদের বাঙালি বৈষম্যের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা পুঞ্জীভুত ক্ষোভ ও আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ৭০এর নির্বাচন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন। তখন মনে করেছিলাম পাকিস্তান রাষ্ট্র শাসনের অধিকার পাবে বাঙালি। কিন্তু নানা তালবাহানায় এই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব না দিয়ে পুর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে শোষণের শঙ্কা জাগিয়ে তুললো পশ্চিম পাকিস্তানিরা। ফারুক ই আজম বলেন, ১৯৬৬ সালে এসএসসি পাশ করার পর বুঝলাম কলেজে পড়া হবেনা। ওই বছরের আগস্ট মাসে পরিবারের অগোচরে কাউকে কিছু না জানিয়ে মাত্র ৫০ টাকা সম্বল করে খুলনার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাতে বাড়ি ছাড়লাম। তখন খুলনায় আমাদের বাড়ির কয়েকজন চাকরি ও ব্যবসা করতেন। ধারণা করেছিলাম, তাদের কাছে গেলে চাকরি পাব। সেখানে পৌছে খুলনায় ইস্টার্ণ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট নামের একটা জলপরিবহন কোম্পানিতে সুপারভাইজার এর চাকরি পেলাম। সেখানেই ১৯৭১ সালের মার্চ পর্যন্ত নিয়মিত চাকরি করেছি। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ হাজার হাজার জনতার সঙ্গে আমিও খুলনার হাদিস পার্কে গেলাম। আলোচনা হচ্ছিল, ঢাকার রেসকোর্স থেকে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা শোনা ছাড়া আর কিছু চাওয়ার নেই আমাদের। যেহেতু ৭ মার্চের ভাষণ তাৎক্ষণিক শুনতে পাইনি, তাই বিভিন্ন আলোচনার ঢালপালা গজাচ্ছিল। কেউ বলেছে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, কেউ বললো করেনি। পরদিন সকালে রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত ভাষণটি শুনতে পাই। এর কয়েকদিন পর আজম খান কলেজের পাশে পাকিস্তানীদের নির্মমতা দেখতে পাই। গুলি করে হত্যা করা ৭/৮ জনের লাশ দেখতে পেলাম। ফারুক ই আজম বলেন, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ সকাল দশটা থেকে তিন ঘন্টার জন্য কারফিউ শিথিল হলে আমরা তিন বন্ধু কাঞ্চন, মোহাম্মদ হেনে ও আমি মুন্সিপাড়া ইসলাম সাহেবের বাড়ির দিকে গেলাম। সেখানে খান জাহান আলী রোডের একটি গলির মুখে ৭/৮ টি লাশ দেখতে পেলাম। বিকেলে মৌলভী পাড়ার গলিতে ঢুকলাম। সেখানে চামড়ায় বাধানো ট্রানজিস্টারে ক্ষিণ কন্ঠে শুনতে পেলাম স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র চট্টগ্রাম থেকে ‘আমি মেজর জিয়া বলছি, …বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্য, বিডিআর,পুলিশ দখলদার পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। সর্বত্র তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহবান জানাচ্ছি। আমি বিশ্বের সব দেশ ও সরকারকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি ও সাহায্যে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানাচ্ছি।’ ফারুক ই আজম বলেন, প্রায় দুই শতাধিক লোক আমরা জড়ো হয়ে নীরব নিস্তব্ধতায় একজন বাঙালি সেনা মেজরের মুখে বহুকাঙ্খিত স্বাধীনতার ঘোষণা শুনলাম এবং যুদ্ধে যাবার আহ্বান শুনে আমাদের মধ্যে বীরত্বের শিহরণ হয়ে গেল। আমার ওই সময় অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। চট্টগ্রামে আমার জন্মানোর সার্থকতায় গর্ববোধ করলাম। এই চট্টগ্রাম থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা। ওই মুহুূর্তে শপথ নিলাম, যে করেই হোক চট্টগ্রাম যাব এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেব। কারফিউ চলছে। ব্যাচেলর বাসা থেকে স্থানীয় তাহের সাহেবের বাসায় তিন বন্ধু উঠলাম। কারফিউ শিথিল হলে অফিসে যাই। তখন থেকেই চট্টগ্রাম ফেরার সুযোগ খুজঁতে থাকি। একদিন জাহাজে চড়লাম এবং চট্টগ্রাম ফিরে আসলাম। তিনি বলেন, ৭১ সালের মে মাসের ৫ তারিখে ২৮ জনের একটি দল রামগড় হয়ে ভারতে যাবার জন্য বাড়ি ছাড়লাম এবং ভারতের সাবরুম হয়ে হরিণা ক্যাম্পে পৌছঁলাম। ওখানে স্বাধীনতার ঘোষক মেজর জিয়াকে দেখার খুব ইচ্ছে হলো। শুনলাম তিনি আগরতলা গেছেন। বিকেলে আমাদের নৌ যুদ্ধের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। সেখানে দেখা হয় ক্যাপ্টেন রফিকের সাথে। ভারতীয় নৌবাহিনীর কমান্ডার জি, মার্টিসের নেতৃত্বে ১ জুন থেকে ভাগিরথি নদীতে জাহাজ বিধ্বংসী মাইন, নোঙ্গরের শিকল কাটা, পানির নিচে বিস্ফোরকের প্রশিক্ষণ আমাদের প্রয়োজনীয় ট্রেনিং করানো হলো। ফারুক ই আজম বলেন, আগস্ট মাসের এক তারিখে পলাশি রেস্ট হাউস কাম জাদুঘরের সামনে আমাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়। প্রশিক্ষণের প্রধান কমান্ডার সামান্তা আমাদের মধ্য থেকে পূর্ব পাকিস্তানের সব নদী ও সমুদ্র বন্দরের জন্য কমান্ডো দল বাছাই করেন। আমি চট্টগ্রামের জন্য বাছাই করা ৬০ জনের দলের অন্তর্ভুক্ত হলাম। দলের অধিনায়ক মনোনীত হলেন আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী। তিনি ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা নাবিকদের একজন ছিলেন। তার ডেপুটি কমান্ডার হলেন শাহ আলম নামে চট্টগ্রাম মেডিকেলের একজন ছাত্র। চট্টগ্রামের দলকে ২০ জন করে তিন ভাগে ভাগ করা হলো। বিভক্ত বিশজনের একটি দলে শাহ আলম অধিনায়ক এবং তাঁর ডেপুটির দায়িত্ব পাই আমি। এভাবে মংলা, খুলনা, চাঁদপুর সহ দেশের নদী ও সমুদ্র বন্দরের জন্য নৌ কমান্ডো দল ঠিক করা হয়। তিনি বলেন, ১১












