
অন্তর্বর্তী সরকারকে স্থানীয় নির্বাচন থেকে সরে আসার আহ্বান- তারেক রহমান
সিনিয়র রিপোর্টার / দ্যা লিগ্যাল ভয়েস টোয়েন্টিফোর মিডিয়া : জাতীয় সংসদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘জনগণ মনে করে, স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে, সেটি হবে সারা দেশে পলাতক স্বৈরাচারের দোসরদের পুনর্বাসনের একটি প্রক্রিয়া, যা সরাসরি গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাবিরোধী। গণহত্যাকারী, টাকা পাচারকারী, দুর্নীতিবাজ, মাফিয়া চক্রকে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার এই ফাঁদে বিএনপি পা দেবে না।’ আজ বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদের এলডি হল সংলগ্ন মাঠে বিএনপির বর্ধিত সভায় ভার্চুয়ালি দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন তারেক রহমান। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘সারা দেশে খুন, হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাই ও রাহাজানি বেড়েই চলেছে। বাজার সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণহীন। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখনও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সরকার যেখানে দেশের বাজার পরিস্থিতি কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করতে পারছে না, সেখানে জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের নামে কেন দেশের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করতে চাইছে, এটি জনগণের কাছে বোধগম্য নয়।’ অন্তর্বর্তী সরকারকে স্থানীয় নির্বাচন থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জন-রায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে গণহত্যাকারী-মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান, সারা দেশে গণহত্যাকারীদের দোসর মাফিয়া চক্রকে পুনর্বাসনের স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা থেকে সরে আসুন। অবিলম্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আগামী দিনের সুনির্দিষ্ট কর্ম পরিকল্পনার রোডম্যাপ ঘোষণা করুন।’ বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য জনমনে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করলেও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কোনো কোনো উপদেষ্টার বিভ্রান্তিমূলক মন্তব্য স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী জনগণের জন্য হতাশার কারণ হয়ে উঠছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি বিএনপিসহ গণতন্ত্রের পক্ষের সব রাজনৈতিক দলের নিঃশর্ত সমর্থন থাকলেও সরকার এখনও তাদের কর্মপরিকল্পনায় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারছে না।’ তারেক রহমান বলেন, ‘স্বৈরাচার শাসক টাকা পাচার আর লুটপাট চালিয়ে দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর করে দিয়েছিল। অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছিল দেশের সব সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করে জনগণকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন করে দিয়ে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করে তুলেছিল।’ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র সরকার এবং রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে মাদার অব ডেমোক্রেসি বেগম খালেদা জিয়া ২০১৭ সালে ভিশন-২০৩০ দিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে বিএনপি ২৭ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। পরবর্তীতে গণতন্ত্রের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ের পর ঘোষণা করা হয় ৩১ দফা কর্মসূচি। এই ৩১ দফা নিয়ে বিএনপির উদ্যোগে সারা দেশে জনগণের সঙ্গে সংলাপ চলছে।’ তারেক রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্র-সরকার-রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দল মেরামতের জন্য দফা ৩১টি হলেও এর চূড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো—একটি নিরাপদ, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ, একইসঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজে জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা। এটি নিশ্চিত করা না গেলে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি কোনটিই টেকসই হবে না।’ তারেক রহমান আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্র ও সমাজে জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত হলো প্রতিটি নাগরিকের ভোট প্রয়োগের অধিকার বাস্তবায়ন। এজন্যই জনগণের ভোটে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যেই জাতীয় নির্বাচনের দাবি জানায় বিএনপি।’ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, আজ ও আগামী দিনের রাজনীতিতে বিএনপির এই ৩১ দফা হচ্ছে একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সনদ। তবে এই ৩১ দফাই শেষ কথা নয়, সময়ের প্রয়োজনে রাষ্ট্র, সরকার, রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের সংস্কারের জন্য এই ৩১ দফায়ও সংযোজন-বিযোজনের সুযোগ রয়েছে। এমনকি, বিএনপির ৩১ দফার সঙ্গে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার প্রস্তাবনার খুব বেশি মৌলিক বিরোধ নেই।’ তারেক রহমান বলেন, ‘মাফিয়া প্রধান হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর এ পর্যন্ত ১৬ থেকে ১৭টি নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বিএনপি সব নতুন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনকে স্বাগত জানায়। তবে নির্বাচনের মাধ্যমে গ্রহণ কিংবা বর্জনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে জনগণ। সুতরাং, প্রতিটি দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সবার আগে নির্বাচন কমিশনকে প্রস্তুত রাখতে হবে।’ তারেক রহমান আরও বলেন, ‘দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নিরপেক্ষতাই হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সবচেয়ে বড় পুঁজি। কিন্তু সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে ইতোমধ্যেই জনমনে সন্দেহ সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। নিজেদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আরও সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানাই।’ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘এবার আমি সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মী, বিশেষ করে এই বর্ধিত সভায় উপস্থিত নেতাদের উদ্দেশে কয়েকটি কথা বলতে চাই। দীর্ঘদিন থেকে আমি আপনাদের কাছ থেকে শারীরিকভাবে দূরে থাকলেও যোগাযোগ এবং কর্ম পরিকল্পনার মাধ্যমে আমি কখনোই আপনাদের কাছ থেকে দূরত্ব অনুভব করিনি। আমার মনে হয়, এখানে উপস্থিত এমন একজনকেও পাওয়া যাবে না, যার সঙ্গে আমার অন্তত একবার হলেও কথা হয়নি কিংবা টেক্সট মেসেজ (খুদে বার্তা) আদান প্রদান হয়নি। তবে আজ এখানে সবাইকে একসঙ্গে পেয়েছি। আপনাদেরকে অভিনন্দন। আমি বিশ্বাস করি, যে দলে আপনাদের মতো ত্যাগী এবং সাহসী নেতাকর্মী রয়েছে সেই দলকে কোনো স্বৈরাচারই দমিয়ে রাখতে পারে না।’ তারেক রহমান আরও বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যে দেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান তথা দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবেন। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বসবাসকারী আমাদের সবার একটিই পরিচয় আমরা বাংলাদেশি।’ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, “পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রেও বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্ট। বিএনপি মনে করে, বর্তমান বিশ্বে স্থায়ী শত্রু-মিত্র বলে কিছু নেই। একটি দেশের সঙ্গে অপর দেশের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা, প্রয়োজন ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে। অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের নীতি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ । অর্থাৎ নিজ দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষাই হতে হবে প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার।” তারেক রহমান বলেন, ‘আশা করি বর্ধিত সভায় এই আলোকেই আপনাদের বক্তব্য উপস্থাপিত হবে। এই মুহূর্তে বিএনপিই দেশের সবচেয়ে বড় এবং জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। ফলে বিএনপির কাছে জনগণের যেমন প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরাও থেমে নেই। সুতরাং চক্রান্তকারীদের মোকাবিলা করে কীভাবে দলকে আরও শক্তিশালী এবং সুসংহত করা যায়, আমি আশা করি, আপনাদের আলোচনায় সেই সম্পর্কেও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা থাকবে।’ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘সারা দেশে তৃণমূল পর্যায়ের কৃষক-শ্রমিক, দরিদ্র-মেহনতি, স্বল্প আয় কিংবা মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তের পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রী, তথা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বার্থ রক্ষা এবং জীবন মানোন্নয়নে আপনাদের নিজ নিজ এলাকাভিত্তিক কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যায়, আপনাদের বক্তব্যে সেসব বিষয়ও থাকবে।’ নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের পক্ষে বিপক্ষে অবশ্যই আপনারা সুনির্দিষ্ট বক্তব্য তুলে ধরবেন। তবে একটি বিষয়ে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, সেটি হলো—বিএনপি একটি বৃহৎ পরিবার। এই পরিবারের নানা বিষয়ে আমাদের মতের অমিল থাকতেই পারে। সুতরাং, বক্তব্য দেওয়ার সময় ব্যক্তিগত পর্যায়ের বিরোধকে এড়িয়ে যাওয়া বাঞ্ছনীয় বলেই আমি মনে করি।’ বিএনপি নেতাকর্মীদের ত্যাগের শিকারের বিষয় উল্লেখ করে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘গত দেড় দশকে সারা দেশে বিএনপিসহ গণতন্ত্রের পক্ষের ভিন্ন দল ও মতের নেতাকর্মীদেরকে অবর্ণনীয় নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে। কেবল বিএনপিরই প্রায়


















