জালাল উদ্দিন/দ্যা লিগ্যাল ভয়েস টোয়েন্টিফোর ডটকম:
‘হামরা নদীপাড়ের মানুষ। সুখ-দুক্কের হিসাব করার সময় নাই। খরা,বান-সাতাও এর সাতে হামার বসবাস। এই তিস্তা নদী হামাক কোনো সময় কান্দায়, ফির হাসায়। এবার চরোত ভালোয় আবাদ হইছে। যদিও খরচাপাতি বেশি নাগচে। কিন্তু যেপাকে দেকমেন খালি সবুজ ক্ষ্যাত চোকোত পড়বে। এ্যলা এই ফসল হাটোত তুলি ভালো দামে ব্যাচা নিয়্যায় হামার চিন্তা।’ ষাটোর্ধ্ব বয়সী মফিজুল ইসলাম। থাকেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত চর ইছলি গ্রামে। নিজের ভিটেমাটি বলতে মফিজুলের তেমন কিছু নেই। ভাঙ্গা-গড়ার খেলায় তিস্তয় বেশ কয়েকবার নদীগর্ভে ঘরবাড়ি বিলীন হারিয়েছেন।
এখন চরের বুকে তোলা দুটো খড়ের ঘর, আর পরের জমিতে চাষাবাদ করা ফসলই তার সম্পদ। একারণে বৃদ্ধ বয়সেও হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করছেন তিনি।আরেক কৃষক হাসেম আলী। তিনি নিজের উৎপাদিত সবজি বিক্রি করতে স্থানীয় একটি বাজারে তুলছেন। রসুন ও পেঁয়াজের পাশাপাশি সাথী ফসল হিসেবে বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ করেছেন। চলতি মৌসুমে গঙ্গাচড়ার মহিপুর চরে ২ বিঘা জমিতে রসুন ও পেঁয়াজের পাশাপাশি এক একর জমিতে আলুও আবাদ করেছেন। মফিজুল আর হাসেম আলীর মতো হাজারো কৃষকের এখন দম ফেলানোর ফুসরত নেই। তিস্তার বিভিন্ন চরে আলু, রসুন, মরিচ, পেঁয়াজ, ভূট্টা, শশা ও মিষ্টি কুমড়াসহ নানা ধরনের ফসলের পরিচর্যা চলছে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। যেসব ফসল একটু আগাম রোপন করা হয়েছে, এখন সেগুলো তোলা হচ্ছে বাজারে। নদীর বুকে জেগে উঠা বিশাল চর ঘিরে কৃষকের ব্যস্ততা শুধু রংপুরেই নয়। এই মৌসুমে ব্যস্ততা বেড়েছে চরকেন্দ্রিক নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে। তিস্তা, ধরলা, ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, করতোয়া, যমুনেশ্বরীসহ অসংখ্য নদ-নদী বিধৌত উত্তরের চরগুলো এখন ‘হিডেন ডায়মন্ড’।
প্রতি বছর এসব চরে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকার ফসল। শুধু ফসল উৎপাদনেই থেমে নেই চরাঞ্চলের কৃষকেরা। বছরে ২৫ লাখ গবাদিপশুর যোগানও দিচ্ছেন তারা। তবে আকষ্মিক বন্যা, খরাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় সময়ই তাদের হোঁচট খেতে হয়। সেইসাথে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হতে হচ্ছে চরের কৃষকদের। ভারত থেকে বাংলায় বহমান তিস্তকে বলা হয় উত্তরের জীবনরেখা। মাস চারেক আগেও এই নদী ছিলো পানিতে টইটুম্বুর। এখন পানি নেই, নৌকার পাল তুলে নেই মাঝির হাঁকডাকও। পানিশুন্য তিস্তার বুকে শুকিয়ে জেগে উঠেছে চর। আর এসব চরে ফসল ফলিয়ে খাদ্যের যোগান দিয়ে নিরব বিপ্লব ঘটিয়ে যাচ্ছেন মফিজুল-হাসেমের মতো কৃষকেরা। যে তিস্তা রাক্ষুসে কখনো কাঁদায় এখন সেই তিস্তার চর যেন সবুজময় আশির্বাদের চাদরে ছেয়েছে। চলছে মাঘের ক্রান্তিকাল, আসছে বসস্তময় ফাল্গুন। তবুও চরাঞ্চলে ভোরটা যেন কুশায়াময়। আছে শীতের হালকা কাঁপুনি। এই শীতের সকালে চর ইছলিতে নিজের জমিতে স্বামী-সস্তানকে সাথে নিয়ে ব্যস্ত আরজিনা বেগম। ২০ শতাংশ জমিতে আবাদ করেছেন রসুন আর পেঁয়াজ। পরিবারের জোগানের বাকিটা স্থানীয় বাজারে বেচে সংসারের অর্থের যোগান হয় তার।এই প্রতিবেদককে আরজিনা বেগম বলেন, ‘কষ্ট না করলে খামো কি? হামার তো সারাবছর কষ্ট।
নুন আনতে পস্তা ফুরি যায়। এবার জিনিসপাতির দাম বাড়ছে। মাইনসের কাছোত কিছু টাকা ধার (ঋণ) করছি বাহে। তাকে দিয়্যা খিরা (শশা), রসুন আর পেঁয়াজ করছি। এ্যলাতো সার, বীজের দাম বেশি। ভাগ্যিস হামাক কামলা নেওয়া লাগে না। তা না হইলে খরচ আরো বেশি নাগিল হয়।’ গঙ্গাচড়ার চর চল্লিশা গ্রামের একটি চরে আলু তুলছেন মুমিন ও সাত্তার। বিকেলের আগে শহরে পৌঁছানোর তাড়া তাদের। মূল সড়ক থেকে এই চরের দূরত্ব প্রায় ৭ কিলোমিটার। চরাঞ্চলগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য সাধারণত ঘোড়ারগাড়ি, ঠেলাগাড়ি, গরুরগাড়ি এবং বাইসাইকেল ব্যবহার করেন চাষীরা। চরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে প্রায় সময়ই উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন তারা। কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, ‘আমরা কষ্ট করে ফসল তুলে হাটে নেই, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাই না। বেশির ভাগ কৃষকের একই অবস্থা। আমাদের এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব বেশি ভালো না। যদিও পাইকাররা একেবারে জমি থেকে ফসল কিনতে পারত, তাহলে আমরা বেশি উপকৃত হতাম।
কিন্তু মূল সড়কটি ছাড়া আমাদের চর এলাকার কমবেশি সবগুলো সড়কই গ্রামীণ অবকাঠামোয় গড়া। একারণে দূর-দূরাস্তের ব্যবসায়ী ও পাইকারদের কষ্ট করে এত দূরে আসতে অনীহা। ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা থেকে বছরের পর বছর কষ্ট করে যাচ্ছি।’ তিস্তায় ভিটেমাটি হারানো শত শত মানুষ এখন ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন। আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরতে শুরু করেছে তিস্তা নদীর চরাঞ্চলের প্রতিটি ঘরে। খরস্রোত নদীর চরের এখন সব দিকটাই সবুজপ্রাস্তর। এই মৌসুমে উত্তরের চরগুলোতে বেড়েছে চাষাবাদ। রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রামসহ পুরো উত্তর জনপদে কৃষি বিপ্লবের অন্যতম হাতিয়ার নদীর বুকে জেগে ওঠা চরের আবাদি ফসল। জানা গেছে, নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় নদীবেষ্টিত চর ২ হাজার ৯৪৫ হেক্টর আর জলঢাকায় ৩২৮ হেক্টর। ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী, খালিশা চাপানী, টেপাখড়িবাড়ী, পূর্ব ছাতনাই, গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ী ও শোলমারী ইউনিয়নে তিস্তার ছোট-বড় প্রায় ২৩টি চর আছে। এসব চরের বেশির ভাগ বালুর বুকে সুখের দোল খাচ্ছে সবুজের ফলন। একই চিত্র লালমনিরহাটে। এই জেলার সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতিবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তার বিস্তীর্ণ চরে চাষিরা ফলাচ্ছেন সোনার ফসল।
এখানকার চরাঞ্চলের সবজির প্রচুর্য দেখে যে কারও চোখ জুড়াবে। ফসলের বাম্পার ফলনের সফলতায় হাসি ফুটেছে কৃষকের ঘরে ঘরে। লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তার চরবেষ্টিত খুনিয়াগাছ এলাকার বাসিন্দা মহুবর আলী বলেন, গতবছর এগুলো জমিতে পানি ছিলো। এবছর চর পড়ছে। আমি এইবার ৪ বিঘা জমিতে মিষ্টি কুমড়া চাষ করছি। পাশেই তিস্তার ছোট ছোট নালায় পানি আছে। ওখান থেকে পানি এনে গাছের গোড়ায় দেই। ফসল ভালো হয়েছে। আল্লাহ দিলে এবার লাভ হবে।একই এলাকার নুরুমন্ডল বলেন, এই চরে আমাদের ভাগ্য বদলে গেছে। বন্যা মৌসুমে আমাদের দুর্ভোগে থাকতে হয়। তখন আমাদের কষ্ট বোঝানোর মতো কাউকে খুঁজে পাইনা। কেউ সাহায্য করে না। এই মৌসুমে তিস্তায় অনেক বেশি চর পড়েছে। আমাদের জমিগুলো চরে ভেসে উঠেছে। এটা আমাদের মতো গরীবের জন্য আল্লাহর রহমত-ভালোবাসা। এইবার আমরা চর থেকে অনেক লাভবান হতে পারবো।লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানান, তিস্তার বুকে এবছর চরের পরিমাণ ১০ হাজার ৮০০ হেক্টর। যার মধ্যে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে ফসলের চাষাবাদ হয়েছে। যা গতবছরের তুলনায় ৫০০ হেক্টর বেশি। ফসল ভালো হবার পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত বাজার মূল্য থাকলে তিস্তার চর থেকে কৃষকরা পাবে ২০০ ৯২ কোটি ১৫ লাখ ৫৬ হাজার ১৩৭ টাকা। এই মৌসুমে তিস্তার চরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ফসল চাষাবাদ হবে। এ ব্যাপারে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হামিদুর রহমান জানান, গতবছরের তুলনায় এবছর তিস্তার চরে বেশি চাষাবাদ হয়েছে। ফসলও অনেকটা ভালো হয়েছে। চরের জমি চাষে, চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
চলছে আবাদের প্লট প্রদর্শনী। সেই সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পে থেকে চাষিদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হচ্ছে।নদী গবেষক ও উন্নয়ন বিশ্লেষকরা বলছেন, কৃষি জমি কমতে থাকায় চরগুলোই দেশের ভবিষ্যৎ খাদ্যের যোগানের কেন্দ্রবিন্দু। তিস্তার া বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান বলেন, নদী শাসনের মধ্য দিয়ে চরগুলোতে সুরঙ্গ করা গেলে দেশের কৃষিতে বড় অবদান রাখা সম্ভব। একই সাথে বৈশ্বিক এই সংকটে খাদ্য উৎপাদনের বড় যোগান হতে পারে দেশের উত্তরের চরাঞ্চলগুলো।রংপুর বিভাগ মূলত চরের জন্য বেশ সুপরিচিত। বিভাগে ছোট-বড় মিলিয়ে এমন চরের সংখ্যা ছয় শতাধিকেরও বেশি। শুকনো মৌসুম ছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময় এসব চরে নানা ধরনের ফসল ফলিয়ে থাকেন কৃষকরা। স্থানীয় চাহিয়া মিটিয়ে এসব ফসল চলে যাচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে। চরাঞ্চলের কৃষকরা বন্যা-খরাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে উৎপাদিত ফসলে দেশের খাদ্য চাহিদার বড় একটি অংশের যোগান দিয়ে যাচ্ছেন।রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, রংপুর অঞ্চলে প্রায় এক লাখ হেক্টর চরে আবাদ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ফসল। এরই মধ্যে চর অঞ্চলের কৃষকদের সহযোগীতায় কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যাতে উৎপাদন বাড়বে দ্বিগুন। প্রতি বছর উত্তরের চরগুলোতে পপ্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে শুধু কৃষিতেই নয় গবাদি পশুর চাহিদারও বড় একটি জোগান দিয়ে থাকেন চরের বাসিন্দারা। প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য বলছে, প্রতি বছর উত্তরাঞ্চলের চরগুলোতে প্রায় ২৫ লাখ গবাদি পশু লালন-পালন হয়ে থাকে। যার বাজার মূল্য এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। তবে আকস্মিক বন্যা আর নদী ভাঙনে এসব গবাদি পশু নিয়ে বিপদে পরতে হয় চরবাসীদের।বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও উন্নয়ন গবেষক কুস্তলা চৌধুরী বলেন,চরাঞ্চলের বাসিন্দান্দের জন্য কৃষিতে বিশেষ ব্যবস্থাপনার গুত্ব দিতে হবে। একই সাথে তালিকা প্রণয়নের মাধ্যমে জলবায়ু ঝুঁকি বীমার আওতায় আনার পরামর্শ তাদের।তিনি আরও বলেন, প্রতিবছর দেশে শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ কৃষি জমি কমছে। কিন্তু পরিমাণ বাড়ছে চরের। তাই চরের কৃষি ব্যবস্থাপনার বিশেষ প্রকল্পের পাশাপাশি বন্যা, খরাসহ প্রাকৃতিক দূর্যোগ সহনীয় নানা রকম ফসলের জাত উদ্ভাবনের ওপর নজর দেয়া জরুরি।
















