// দ্যা লিগ্যাল ভয়েস টোয়েন্টিফোর মিডিয়া //
দেশে সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের সর্বশেষ শিকার হলেন গোলাম রব্বানী নাদিম। তিন হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত আর দম রাখতে পারেননি; চিরতরে ছেড়ে দিয়েছেন। একের পর এক হত্যা, হামলা, হুমকির মুখে স্থানীয় সাংবাদিকদের বাকিরা কতদিন দম রাখতে পারেন– এই ঘটনা সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।
নাদিম অনলাইন পোর্টাল বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জামালপুর জেলা প্রতিনিধি এবং একাত্তর টিভির বকশীগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। থাকতেন বকশীগঞ্জেই। পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, বুধবার রাত ১০টার দিকে পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। বকশীগঞ্জের সরকারি কলেজ মোড় এলাকায় তাঁকে ১০-১২ জন মিলে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও পিটিয়ে রক্তাক্ত করে ফেলে যায়। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে বকশীগঞ্জ উপজেলা হাসপাতাল, পরে জামালপুর জেলা হাসপাতাল; সবশেষে বিভাগীয় সদর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর মৃত্যু ঘটে। (সমকাল অনলাইন, ১৫ জুন ২০২৩)।
প্রায় সব সংবাদমাধ্যম বলছে, গোলাম রব্বানি নাদিম নিহত হয়েছেন ‘সন্ত্রাসীদের হামলায়’। কারা এই সন্ত্রাসী? কথায় আছে– ছিঁচকে সন্ত্রাসীরা ‘ট্রিপল পি’ এড়িয়ে চলে। সেই তিন হলো পুলিশ, প্রেস, প্রসিকিউটর– আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সাংবাদিক ও আইনজীবী। কিন্তু এই সন্ত্রাসীরা সেই আপ্তবাক্যকে পরোয়া করেনি। রীতিমতো প্রকাশ্য রাস্তায় একজন সাংবাদিককে পথ আটকে হত্যা করে চলে গেছে।
কারণ নাদিমের হত্যাকারীরা ছিঁচকে সন্ত্রাসী তো নয়ই, এমনকি ‘ধ্রুপদি’ সন্ত্রাসী নয়। সবাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ সংগঠনের সদস্য। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও খুঁটির জোর তাদের আর্থসামাজিক প্রভাব বাড়িয়েছে; ‘জনপ্রতিনিধি’ বানিয়েছে এবং নির্বিচার সন্ত্রাসের লাইসেন্স দিয়েছে। যেমন হামলা ও হত্যার মূল হোতা হিসেবে বকশীগঞ্জ উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়নের যে চেয়ারম্যানের নাম এসেছে, সেই মাহমুদুল আলম বাবু ইউনিয়ন আওমী লীগেরও সভাপতি। তিনি কী ধরনের ভোটে চেয়ারম্যান হয়েছেন, তা এখন স্পষ্ট।
প্রত্যক্ষদর্শী ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র উল্লেখ করে সমকাল জানাচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের সময় চেয়ারম্যান বাবু ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে সবকিছু তদারক করেন। তাঁর ছেলে ফাহিম ফয়সাল রিফাতের নেতৃত্বে হামলায় জড়িত আরও যে আটজনের পরিচয় পেয়েছে পুলিশ, তাঁদের মধ্যে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও তাঁতী লীগের একাধিক নেতাও রয়েছেন। (সমকাল, ১৬ জুন ২০২৩)। জবরদস্ত দলীয় ঐকমত্যের ব্যাপার।
প্রায় সব সংবাদমাধ্যম বলছে– সন্ত্রাসীরা নাদিমকে কুপিয়ে, মেরে, রক্তাক্ত করে ‘পালিয়ে’ গেছে। খবর পড়তে গিয়ে মনে হয়, পালিয়ে যাওয়ার চিত্রকল্প যেন নিজেই নিজেকে দেওয়া সান্ত্বনা-শব্দ মাত্র। পালিয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে, অতর্কিতে হামলা চালিয়ে চলে যাওয়া। নাদিম হত্যাকাণ্ডে কী ঘটেছে? হামলাকারীরা বীরদর্পে তাঁকে আটকিয়ে মেরে যথাসাধ্য রক্তাক্ত করে যখন দেখেছে অচেতন হয়ে পড়েছে, তখন মৃত ভেবে ফেলে রেখে গেছে। পালিয়ে যাওয়ার কাপুরুষতা তারা দেখায়নি। ক্ষমতার দাপটেই যে তারা এটা করেছে, সেটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই।
অপকর্ম, নারী নির্যাতন, দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় নাদিমসহ কয়েকজনের ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন বাবু চেয়ারম্যান। পরে ওই সাংবাদিকদের নামে ডিজিটাল আইনে মামলা করেন তিনি। সেই মামলা বুধবারই ময়মনসিংহের সাইবার ট্রাইব্যুনালে খারিজ হয়ে যায়। সম্ভবত, বৈদেশিক চাপ না থাকলে ওই মামলা গৃহীত হতো। এ থেকে বোঝা যায়, ডিএসএ আসলে কাদের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। মামলা দিয়ে শায়েস্তা করতে না পেরেই হামলা ও হত্যাকাণ্ড।
গোলাম রব্বানী নাদিম
শুধু বাবু চেয়ারম্যান নন; স্থানীয় আওয়ামী লীগের আরও নেতাকর্মী গোলাম রব্বানি নাদিমের ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন। তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ আল মামুন রিফাতের ভাষ্য অনুযায়ী, বকশীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি শাহীনা বেগম এবং সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন তালুকদার বাবুলও নাদিমের ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন। কারণ ওই দুইজনের পরিবারের সদস্যরা স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন মর্মে নাদিম চলতি বছর সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন। এর পর থেকেই তিনি নানা রকম হুমকি পাচ্ছিলেন।
গত এপ্রিল মাসেও স্থানীয় যুবলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী সাংবাদিক নাদিমকে মারধর করেছিল। ওই ঘটনায় বকশীগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের শামীম খন্দকার ও শেখ ফরিদ এবং পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য স্বপন মণ্ডলের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছিলেন তিনি।
বস্তুত ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরাও কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে; তাদের হামলা, মামলায় কীভাবে স্থানীয় সাংবাদিকতা ক্রমশ কঠিন হয় উঠেছে; এর ‘টেক্সটবুক এক্সাম্পল’ হতে পারে নাদিম হত্যাকাণ্ড। এরা বিচ্ছিন্নভাবে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে– এমন নয়। এসব করে আশকারা ও পার পায় বলেই অপরাধের মাত্রা দিনের পর দিন বাড়ছে। কে না জানে– ছাগল নড়ে খুঁটির জোরে!
সাংবাদিকতা কঠিন হয়ে উঠেছে, হামলার প্রতিকার বা হত্যাকাণ্ডের বিচার না পাওয়ার কারণেও। নাদিমকে দিয়েই উদাহরণ দেওয়া সম্ভব। গত এপ্রিলে তাঁর ওপর যুবলীগ কর্মীদের হামলার পর থানায় লিখিত অভিযোগ জানালেও শেষ পর্যন্ত ‘মিটমাট’ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এপ্রিলের হামলার ঘটনার যদি আইনি প্রতিকার পাওয়া যেত, তাহলে হত্যাকারীরা এতটা বেপরোয়া না-ও হতে পারত। নাদিম হয়তো স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে প্রাণে বেঁচে থাকতে পারতেন।
পুলিশ যে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীর অপরাধ দেখেও না দেখার ভান করবে বা ধরি মাছ না ছুঁই পানি ব্যবস্থা নেবে– সেটা জানা কথাই। কিন্তু ওই ঘটনা আইন-আদালতের বাইরে মিটমাট করতে ভূমিকা রেখেছিল স্থানীয় সাংবাদিকদেরই একটি অংশ।
নাদিমকে মিটমাট করতে বাধ্য করেছিল যে সাংবাদিকরা, তারা কারা? যে কোনো জনপদে গেলেই তাদের জ্ঞাতি ভাইদের দেখা পাওয়া যাবে। তারা সাংবাদিকতার নামে ক্ষমতাসীনদের উচ্ছিষ্ট খেয়ে বাঁচে। তারা চাঁদাবাজি করে, দুর্নীতির ভাগ নেয়। একাধিক প্রেস ক্লাব খুলে বসে থাকে। সাংবাদিকতা বাদ দিয়ে আর সবকিছু করে। তারা স্থানীয় নেতা, চেয়ারম্যান, এমপি বা মন্ত্রী, ইউএনও বা ডিসির ‘পারিষদ’ হয়ে ঘোরে। কেউ সাংবাদিকতা করতে চাইলে, সেটা ওই নেতা বা জননেতার বিপক্ষে গেলে দেখা যায়– ‘বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ’।
বিভিন্ন জনপদে গড়ে ওটা রাজনীতিক-আমলা-পারিষদ চক্রের আঁতাতের বাইরে গিয়ে যাঁরা সাংবাদিকতা করতে চেয়েছেন, তাঁরা হামলা-মামলা এমনকি হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। ২০০৫ সালের ১৭ নভেম্বর সমকালের ফরিদপুর ব্যুরোপ্রধান গৌতম দাস এবং ২০১৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের সমকাল প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুলও সাহসী সাংবাদিকতা করতে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক ‘কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্ট’ বলছে, ১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশে ৩২ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। সেই তালিকায় অবশ্য সর্বশেষ নিহত গোলাম রব্বানি নাদিম এবং চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছুরিকাঘাতে নিহত সাংবাদিক আশিকুল ইসলাম আশিকের নাম নেই।
এদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৩ মাসে দেশে ৫৬ জন সাংবাদিক নির্যাতন, হয়রানি, হুমকি, মামলা ও পেশাগত কাজে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে সন্ত্রাসীরা এতটা বেপরোয়া হতে পারত না। //
রিপোর্টার্স সানস ফ্রন্টিয়ার্স জানিয়েছে, ২০২৩ সালে সাংবাদিকতার স্বাধীনতাবিষয়ক সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৩। তার আগের বছর থেকে এক ধাপ পিছিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে নিম্ন অবস্থানে। সূচকমতে, বাংলাদেশসহ যে ৩১টি দেশে সাংবাদিকতায় ‘খুবই গুরুতর পরিস্থিতি’ বিরাজ করছে তার মধ্যে রয়েছে মিয়ানমার, উত্তর কোরিয়া, সিরিয়া, আফগানিস্তানের মতো দেশও।
সাংবাদিক তো বধযোগ্য প্রাণী। ভালো তো, ভালো না?
শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; সহযোগী সম্পাদক, সমকাল
















