সিনিয়র রিপোর্টা/ দ্যা লিগ্যাল ভয়েস টোয়েন্টিফোর ডটকম :
ব্যাংক ব্যবস্থা দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশে ব্যাংক ব্যবস্থার যাত্রা। বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ ১৯৭২ এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। দেশের অর্থনীতির আকার বাড়তে থাকলে আশির দশকের প্রথম দিক থেকেই বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া শুরু হয়। বর্তমানে দেশে ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, ৪৩টি বেসরকারি ব্যাংক, নয়টি বিদেশী ব্যাংক ও তিনটি বিশেষায়িত ব্যাংক এবং ৩৪টি দেশী-বিদেশী আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতিকে সামাল দিচ্ছে।
বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার খবর এবং প্রকাশিত বেশকিছু নিবন্ধ পাঠে জানা যায় যে বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। অবশ্য ব্যাংক খাতের সমস্যা দীর্ঘদিনের। প্রথমত, সুশাসনের অভাব। ব্যাংক যারা পরিচালনা করছেন এবং যারা কর্মকর্তা হিসেবে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন তাদের অধিকাংশের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই। দ্বিতীয়ত, যেসব আইন-কানুন, নীতিমালা, বিধি-বিধানের মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালিত হওয়ার কথা সেসব যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। তৃতীয়ত, ব্যাংকের অনেক পরিচালকের মধ্যেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। এদের কেউ কেউ নামে-বেনামে শত শত কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে। চতুর্থত, ঋণ গ্রহণের নামে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আর পরিশোধ করছে না। দিন দিন খেলাপি ঋণ বাড়ছে। পঞ্চমত, পরিচালনা পর্ষদে নিয়োজিত কিছু পরিচালক ব্যাংক ব্যবস্থাপনার কাজে বিশেষ করে ঋণ মঞ্জুরির ক্ষেত্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে। সর্বোপরি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর তদারকির অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
একটি দেশের অর্থনীতি ব্যাংক খাতের ওপর ভর করে চলে, অথচ বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাত নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আস্থার সংকট। আমানতকারীদের মুনাফা দেয়া হয় ৩ থেকে ৬ শতাংশ হারে। এরই মধ্যে যুক্ত হয়েছে আমানতের টাকা খোয়া যাওয়ার ভয়। যদি কোনো ব্যাংক বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়, সরকার হয়তো জনগণের টাকা দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখবে। কিন্তু আমানতকারী ও গ্রাহকদের হয়রানি সহজে মিটবে না। এ পর্যন্ত যারা ব্যাংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তাদের কম সংখ্যককেই বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। সেজন্য ক’দিন আগেও গুজব ছিল, অনেকে ব্যাংকে সঞ্চিত টাকা উঠিয়ে ঘরে নগদ রেখে দিচ্ছে কিংবা বাধ্য হয়ে রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করছে।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গত অক্টোবরে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দুর্বল করপোরেট শাসন ব্যবস্থা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং স্বচ্ছতার অভাব বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে। এখানে ব্যাংক খাত নিয়ন্ত্রণ করে এমন সব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, যাদের আসল আগ্রহ অন্যত্র। বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ বা ব্যবসায়ী গ্রুপের মালিকরা ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করে।’
ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ প্রক্রিয়া কাগজে-কলমে খুব সহজ নয়। চালু ব্যবসা বা শিল্প-কারখানা থাকলে বিভিন্ন বিধি পদ্ধতি পরিপালন করে জামানতের বিপরীতে ঋণ গ্রহণ করতে হয়। স্টার্টআপ শিল্পে ঋণ পেতে হলে প্রকৃত জামানতের সঙ্গে ঋণগ্রহীতার পরিচিতিও ভালোভাবে দেখা হয়। ঋণ গ্রহণের পর নির্ধারিত সময় থেকেই ঋণ পরিশোধ শুরু করতে হয়। দুই যুগ আগেও এ নিয়মের ব্যত্যয় করতে ব্যাংক কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কিংবা পরিচালনা পর্ষদকে দেখা যেত না। কিন্তু পর্যায়ক্রমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আইনের শাসন ও নীতি-নৈতিকতার চরম অবনতি ঘটতে থাকে। পরস্পর যোগসাজশে সম্পত্তি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির ভুয়া কাগজপত্র তৈরি হতে থাকে। ঋণ দীর্ঘদিন খেলাপি হওয়ার পর দেখা যায় ঋণগ্রহীতার দেয়া জামানত ঋণ আদায়ের জন্য পর্যাপ্ত নয়। তাছাড়া ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালকদের ইচ্ছায় অনেক ঋণ দেয়ার পর সেগুলো অনাদায়ী হয়ে পড়ে।
বর্তমানে ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যাই হচ্ছে খেলাপি ঋণ। অনেক প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা শত শত, হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছে এবং তাদের ব্যবসা বা শিল্প-কারখানা সচল থাকলেও ঋণ পরিশোধ করছে না। কয়েক বছর পর পর আসল টাকা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সুদ মওকুফ করিয়ে নিচ্ছে। দুই বা চার কিস্তি পরিশোধ করে আবার খেলাপি হয়ে যাচ্ছে।
ছোট ছোট ঋণগ্রহীতার ওপর ব্যাংকের কড়া নজরদারি, পিডিআর অ্যাক্টে মামলা ইত্যাদি থাকলেও প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের ধরতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কঠোর হতে পারছে না। খেলাপি ঋণ কমানোর কথা বলে বিভিন্ন সময়ে ঋণখেলাপিদের নানা সুবিধা ও প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ঋণখেলাপিদের মাত্র ২ শতাংশ ঋণ পরিশোধ করে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের সুবিধা দেয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় ঋণ পুনঃতফসিল করে অনেক ঋণখেলাপি ব্যবসায়ী আরো নতুন ঋণ গ্রহণ করে। নভেল করোনাভাইরাস মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়লে সরকার ব্যবসায়ীদের প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা এ প্রণোদনার অর্থ কম পেলেও বড় বড় ব্যবসায়ী ও তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী ব্যবসায়ীরা বরাদ্দকৃত সম্পূর্ণ টাকা ঠিকই উঠিয়ে নেন। এছাড়া করোনাকালে ঋণের কিস্তি প্রদানও স্থগিত রাখা হয়।
ব্যবসায়ীদের কাছে ব্যাংকের টাকা সহজে পৌঁছানোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতের সুদের হার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ এবং ঋণ প্রদানের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়। তফসিলি ব্যাংকগুলো যাতে বেশি হারে ঋণ দিতে পারে এবং তারল্য সংকট না হয় সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত স্ট্যাটুটরি রিজার্ভ রেশিও (এসআরআর) এবং ক্যাশ রিজার্ভ রেশিওর (সিআরআর) পরিমাণ কমিয়ে দেয়া হয়।
উল্লিখিত সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ঋণগ্রহীতারা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে আবার খেলাপি হচ্ছেন। ব্যাংক অর্থঋণ আদালতে মামলা করলে সেসব মামলা বছরের পর বছর ধরে চলে। কখনো কখনো বড় ঋণগ্রহীতাদের কেউ কেউ
চলমান…..














